বিলুপ্তের পথে বরিশালের ৪শত বছরের পুরোনো লাকুটিয়া জমিদার বাড়ি Latest Update News of Bangladesh

শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২, ০৫:১৯ অপরাহ্ন

বিজ্ঞপ্তি :
Latest Update Bangla News 24/7 আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি ভয়েস অব বরিশালকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] অথবা [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।*** প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে!! বরিশাল বিভাগের সমস্ত জেলা,উপজেলা,বরিশাল মহানগরীর ৩০টি ওয়ার্ড ও ক্যাম্পাসে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে! ফোন: ০১৭৬৩৬৫৩২৮৩




বিলুপ্তের পথে বরিশালের ৪শত বছরের পুরোনো লাকুটিয়া জমিদার বাড়ি

বিলুপ্তের পথে বরিশালের ৪শত বছরের পুরোনো লাকুটিয়া জমিদার বাড়ি




প্রিন্স তালুকদার॥  বরিশালের লাকুটিয়া জমিদার বাড়ী, বাড়ীটিতে আজ জমিদারী নেই, নেই জমিদারও। রাজা রায়চন্দ্র রায় কর্তৃক উনিশ শতকে নির্মিত এই বাড়িটি বরিশাল বিভাগের মধ্যে একটি অন্যতম বাড়ি ৪শত বছরের পুরোনো জমিদার বাড়ী। বিট্রিশ আমলে ৪৯ দশমিক ৫০একর জমি নিয়ে বাড়িটি নির্মান হলেও অযতœ অবহেলায় লাকুটিয়া জমিদার বাড়ি এখন ভূতুড়ে বাড়ী, ধ্বংসাবেশেষ। বাড়িটির চারদিক থেকে আস্তে আস্তে দেয়ালগুলো ধরে পরেছে। বাড়িটির দোতলায় উঠার কোনো উপায়ই নেই, বাইরের দিক থেকে উঠে যাওয়া সিঁড়ি ভেঙে আছে। স্বাভাবিকভাবে সম্ভব নয়।

উঠতে হলে টেনে হিসরে উঠতে হয়। অথচ এই বাড়িটি সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের পীঠস্থান হিসেবে ব্যাপক পরিচিত ছিলো। এই পরিবারের সদস্যদের খ্যাতি ছিলো প্রজাকল্যাণ এবং বিবিধ জনহিতকর কার্যক্রমে। এর ধারাবাহিকতায় তৎকালিন সময়ে বরিশাল শহরে নির্মিত হয়েছিলো ‘রাজচন্দ্র কলেজ’। শেরে বাংলা ফজলুল হকের মত ব্যাক্তিত্ব এই কলেজে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন।

নানান ধারায় লাকুটিয়ার জমিদারেরা নির্মান করেছিলেন লাকুটিয়া সড়কটি। এলাকা সূত্র থেকে জানতে পারি, পাকিস্তান আমলে এই এলাকায় ‘পুষ্পরানী বিদ্যালয়’ নামে একটি স্কুল নির্মিত হয়েছিলো। লাকুটিয়া জমিদার বাড়ির শেষ উত্তরাধিকারী বাবু দেবেন্দ্র লাল রায় চৌধুরী প্রায় তিনদশক আগে সপরিবারে কোলকাতা চলে যান। পরে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। দেবেন্দ্র রায় চৌধুরীর কন্যা মন্দিরা রায় চৌধুরীর বিয়ে হয় বরিশাল কাশীপুরের মুখার্জি বাড়ীতে।

বিগত বিএনপি জামাত জোট সরকারের আমলে সারাদেশব্যাপী জঙ্গি সংগঠনের সিরিজ বোমা হামলায় ঝালকাঠী আদালতে নিহত বিচারক জগন্নাথ পাড়ের শ্বাশুড়ী শ্রদ্ধেয়া মন্দিরা মুখার্জি বরিশাল কাশীপুরের মুখার্জি বাড়ীতেই বসবাস করছেন। অশ্রুসজল হয়ে মন্দিরা মুখার্জী বলেন, ‘বাবার বাড়ীর কথা মনে পড়তেই আমি যেন আমার অতীতে ফিরে যাই। আমি দেখতে পাচ্ছি যেন সেদিনের সেসব দৃশ্য। আমার বাবা খুব গাছ লাগাতেন। বাড়ীটির প্রতিটি স্থানে জড়িয়ে রয়েছে আমার স্মৃতি।’ এলাকাবাসি নয় বরিশাল বিভাগের সবাই লাকুটিয়া জমিদার বাড়ী এই নামেই চেনে। ভগ্ন প্রসাদের প্রবেশ মুখে রয়েছে কয়েকটি স্থাপনা, অজানা গুল্মের আশ্রয়ে। সদর দরজার দিকে এগোই, দক্ষিনে বিখ্যাত বউরানির দিঘি, জল এখনো টলটলে, শান বাঁধানো ঘাটে বাতাসের ফিঁসফাঁস। মুল ভবনের সামনে রয়েছে খানেক খানি জমি নিয়ে একটি মাঠ, দোতলা প্রসাদ; এখন কি একে প্রসাদ বলা যায়! অনুসন্ধানে গিয়ে জানতে পারি, জমিদার বাড়িটি লীজ নিয়েছে বিএডিসি অফিস।

বরিশালের লাকুটিয়া জমিদার বাড়িটি নির্মান হয় অনেক মূল্যবানের ইট, পাথর আর সুড়কি দিয়ে। এক সময়ের এই জমিদার বাড়ি এখন পরিত্যক্ত ভুতুরে বাড়িতে পরিনত হয়েছে। অথচ বাড়িটিকে ঘিরে রয়েছে প্রায় ৪শত বছরের পুরনো ইতিহাস। বাড়িটির আশে পাশে রয়েছে নানান বিনোদনীয় দিঘি, মঠ, মাঠ, আর নানান দৃশ্য। বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে দেয়ালে রয়েছে নির্যাতনের ইতিহাস। পুরোনো ভবনের চারিদিকে নানা শিল্পকর্ম ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ভাঙা ভবনের অন্দরে রয়ে গেছে নানা নৃসংসতার টুকরো টুকরো ছবি। দেখা মিলবে জমিদারদের অনেক মন্দির আর সমাধিসৌধ। এগুলোর বেশির ভাগই আটচালা দেউল রীতিতে তৈরি। শিখররীতির মন্দিরও। পাঁচটা মন্দির এখনো বলতে গেলে অক্ষতই আছে। লাখুটিয়া জমিদারদের সব থেকে সুন্দর স্থাপনা হলো মন্দিরগুলো। সবচেয়ে উঁচু মন্দিরের শিলালিপি থেকে জানা গেছে, অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী পংকজ কুমার রায় চৌধুরী তাঁর স্বর্গত পিতা সুরেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরী এবং মাতা পুষ্পরাণী রায় চৌধুরীর পুন্যস্মৃতির উদ্দেশে এটি তৈরি করেছিলেন। খোসালচন্দ্র রায় লিখিত ‘‘বাখরগঞ্জ ইতিহাস গ্রন্থ” থেকে জানা গেছে, রূপচন্দ্র রায় ছিলেন এই জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর পৌত্র রাজচন্দ্র রায়ের সময়ে এর প্রতিপত্তি বাড়ে। তিনিই মূল জমিদার বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। তাঁর বসানো হাটকেই সবাই বলে বাবুরহাট। তিনি প্রজাদরদি ছিলেন। লাখুটিয়া থেকে বরিশাল অবধি রাস্তা তাঁর আমলেই তৈরি হয়েছিল। বেশ ঘটা করে তিনি রাস উৎসব করতেন। তাঁর দুই পুত্র রাখালচন্দ্র রায় ও প্যারীলাল রায় ব্রাহ্মধর্মেও অনুসারী ছিলেন। লোহার দরজা পেরিয়ে জমিদার বাড়ির মূল প্রবেশপথের বাঁ পাশেই শান বাঁধানো ঘাটওলা সুন্দর একটি পুকুর। বাঁ পাশে বিএডিসির ট্রাক্টর রাখার ঘর আর ডান পাশে তাঁদের গোডাউন আর অফিস কক্ষ।

পেছনে আছে পাকা উঠান, বীজ শুকানো হয়। বাড়িটির ওপর কর্তৃপক্ষের কোনো মায়া মমতা আছে বলে মনে হলো না। বাড়ির তিন ধারে ধানের জমি। এলাকাবাসী ও স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি বিশেষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বছর দশেক আগে একবার ছোট বাহাদুর এসেছিলেন। বাড়ির কাছেই আমবাগান। বাগানটি গড়ে উঠেছে বিশাল এক দীঘির পাড়ে। একে সবাই রাণীর দিঘি বলে। শীতের সময় এখানে অনেকেই পিকনিক করতে আসেন। বরিশালের সদর উপজেলায় ঐতিহ্যবাহী লাকুটিয়া জমিদারবাড়িটি সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।

বাড়িটির অধিকাংশ স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে মূল ভবন এবং কয়েকটি মন্দির জরাজীর্ণ অবস্থায় টিকে আছে। জমিদার বাড়িটির অজানা সব ইতিহাস সন্ধানে নেমেছিল দেশবিদেশের উদীয়মান কয়েক তরুন। বেশ কিছুদিন ফটোগ্রাফি, পারফর্মিং আর্ট, ও অন্যান্য জিনিসগুলো শিল্পকর্মে তুলে ধরা হয় বাড়িটির অতীত ইতিহাস আর ঐতিহ্য এবং বর্তমান সময়ের জমিদার বাড়ী। আরো জানাগেছে, তরুন সংগঠনের কাছে জমিদার বাড়িটি তাদের আবাসিক শিল্পকর্ম বিনিময় কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলার পথে প্রান্তরে অতীতকে সংরক্ষনের দায়িত্ব প্রজ¤েœর হাতে তুলে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। কিছু তাহয়তো ক্ষনিকের জন্যই ছিল, নাকি চোখের ওয়াস ছিল। জমিদারের এক উত্তরাধিকারী বাড়িটি সংরক্ষনের দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছিলেন।

তিনি প্রতœতত্ত্ব বিভাগকে বাড়িকে ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছিলেন। প্রতœতত্ত্ব বিভাগ সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ১৯ অক্টোবর অষ্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মোহাম্মদ সফিউর রহমানকে চিঠি লিখেছিলেন অষ্ট্রেলিয়ার উচ্চ আদালতের সলিসিটার এবং লাকুটিয়া জমিদারের আইনি উত্তরাধিকারী পঙ্কজ রায়ের মেয়ে আলপনা রায়। চিঠিতে তিনি জমিদার বাড়িটির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এটিকে ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সুরক্ষার দাবি জানিয়েছিলেন। আলপনা রায়ের চিঠি পাওয়ার পর প্রতœতত্ত্ব বিভাগের পক্ষ থেকে বাড়িটির বর্তমান অবস্থা এবং সার্বিক বিষয়ে একটি প্রস্তাবনা দেওয়ার জন্য বরিশাল জাদুঘরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আলপনা রায় তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন, লাকুটিয়া জমিদার বাড়ির ভবনগুলো রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। সম্প্রতি তাঁরা বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানতে পেরেছেন, জমিদারবাড়ির মূল ভবনটি ভেঙে ফেলা হতে পারে। বিষয়টি জমিদার পরিবারের উত্তরাধিকারদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বরিশাল জাদুঘর সূত্র জানায়, সম্প্রতি জাদুঘরের কর্মকর্তারা জমিদারবাড়িটি পরিদর্শন করেছেন। তাঁরা একটি প্রতিবেদন প্রতœতত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে জমা দিয়েছেন।

এতে বলা হয়েছে, বাড়িটির মূল দোতলা ভবনটি টিকে আছে। এ ছাড়া পাঁচটি মন্দির, তিনটি বড় এবং একটি ছোট পুকুর রয়েছে। বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, প্রতœতত্ত্ব বিভাগ গ্রহন করে সুরক্ষার উদ্যোগ নিলে ঐতিহাসিক এই জমিদার বাড়ি বরিশাল বিভাগের একটি বড় নিদর্শন হবে। বিএডিসির বরিশালের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক শেখ ইকবাল আহমেদ বলেন, বিএডিসি কয়েক বছর ধরে বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণের জন্য এই এলাকা ব্যবহার করে আসছে। এই বাড়ি একটি বড় ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন। কিন্তু তাঁদের বরাদ্দ না থাকায় দালান ও মন্দির সংরক্ষনের কাজ করতে পারেনি।

এই বাড়ি সুরক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া হলে তাঁরা যথাসাধ্য সহযোগিতা করবেন। ঐতিহ্যবাহী এই জমিদার বাড়িটি অবহেলতি থাকলেও থেমে নেই পর্যকটদের জমিদার বাড়ি দেখার ভিড়, মধ্য বয়সী মানুষ হতে নানা বয়সের মানষের ভিড় থাকে এখানে। বর্তমানে জমিদার বাড়িটি উন্নয়নের হাত না লাগায় হারিয়ে যাচ্ছে বরিশালের ৪শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্য।

সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করুন



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *










Facebook

Shares
© ভয়েস অব বরিশাল কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed BY: AMS IT BD
Shares