মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক॥ বছর তিনেক আগেও এই শহরে পতিতাবৃত্তি করতেন। হোটেলে হোটেলে রাত কাটাতেন। এক রাতের অভিযানে পুলিশের হাতে আটক হন। পুলিশের হাত ঘুরে ঠাঁই হয় সামাজিক প্রতিবন্ধী কেন্দ্রে। প্রশিক্ষণ শেষে বসেন বিয়ের পিড়িতে। সমাজসেবার ঋণে পাল্টে যায় নব-দম্পতির জীবন। ঋণের টাকায় মুরগী-মাছের যৌথ খামার গড়ে তোলেন। সংসার জীবনে এই দম্পতির রয়েছে দুই সন্তান। এটা বরিশাল শহরের সামাজিক প্রতিবন্ধী একটি মেয়ের ঘটনা।
দ্বিতীয় ঘটনাটির আরেক সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়ের। যার মা পতিতাবৃত্তি করে সংসার চালাতেন। মেয়ের বয়স যখন ১৪ ছুঁই ছুঁই তখন মায়ের জোড়াজুড়িতে পতিতাবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়েন। বছর দুয়েক আগে মাদারীপুর পুলিশের হাতে আটক হন। অবশেষে আদালতের মাধ্যমে তর ঠাঁই হয় সামাজিক প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন কেন্দ্রে। প্রশিক্ষণ শেষে গত মাস ছয়েক আগে এই নগরীর একটি বুটিক হাউজে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজে যোগদান করেন।
সামাজিক প্রতিবন্ধী এই দুই মেয়েকে যিনি সফলতার পথ দেখিয়েছেন। যার উৎসাহে সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েরা নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন। সেই স্বপ্ন দ্রোষ্টা হচ্ছেন সাজ্জাদ পারভেজ। যিনি সমাজসেবা অধিদপ্তর বরিশালের প্রবেশন অফিসার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। বরিশাল সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপকের অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন।
সাজ্জাদ পারভেজ ব্যবস্থাপকের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকাকালীন সামাজিক প্রতিবন্ধী কেন্দ্রের অন্তত ১৭ জন মেয়েকে প্রশিক্ষণ শেষে পুনর্বাসিত করেছেন। তার এই অসামান্য কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ২০১৯-২০ অর্থ বছরে জাতীয় পর্যায়ে শুদ্ধাচার পুরস্কার পেয়েছেন। এ ছাড়া কর্মদক্ষতা এবং সৃজনশীলতার মাধ্যমে সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছেন। যার কারণে তিনি ইতোপূর্বে জাতীয় পর্যায়ে পরপর দুই বছর শ্রেষ্ঠ প্রবেশন অফিসার হিসেবেও মনোনীত হয়েছিলেন। তিনি ২০১৭ সালে জেলা প্রশাসন পদক পেয়েছিলেন।
ইতোমধ্যে ৫ জন মেয়েকে বিয়ের মাধ্যমে এবং ১২ জন মেয়েকে কাজের মাধ্যমে পুনর্বাসন করেছেন। পুনর্বাসন করেই খান্ত হননি। তারা স্বামীর ঘরে কেমন আছে, সেখানে কোনো সমস্যা আছে কিনা তার নিয়মিত খোঁজ নিচ্ছেন। তার কেন্দ্রে বর্তমানে সামাজিক প্রতিবন্ধী ৩৫টি মেয়ে রয়েছে। করোনা যুদ্ধে নীরব এক যোদ্ধার নাম সাজ্জাদ পারভেজ। করোনার এই ক্লান্তি লগ্নে মানুষ ঘরে বসে সময় কাটালেও সাজ্জাদ পারভেজ ছুটেছেন মানবতার সেবায়। তিনি করোনাকে ভয় নয়, সচেতনতার মাধ্যমে হাসি মুখে জয়ের চেষ্টা করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
প্রবেশন কর্মকর্তা সাজ্জাদ পারভেজ বলেন, করোনাভাইরাস শুরুর পর থেকে করোনা যোদ্ধা হিসেবে মাঠে কাজ করছি। সকল ভয়ভীতি উপেক্ষা করে জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান মহোয়ের নির্দেশে সকাল থেকে রাত অবধি অসহায় মানুষে পাশে রয়েছি। সমাজের পিছিয়ে পড়া প্রতিবন্ধী, হিজড়া সম্প্রদায়, বেদে জনগোষ্ঠী, কর্মহীন মানুষ এবং শিশুদের মাঝে খাদ্য থেকে শুরু করে নগদ অর্থ ও শিশু খাদ্য-ওষুধ বিতরণ করছি।
জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান বলেন, প্রবেশন কর্মকর্তা সাজ্জাদ পারভেজ সততা আর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন। বরিশাল সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র সুষ্ঠু-সুন্দর ও সুশৃংখলভাবে পরিচালনা করছেন। একই সাথে করোনা শুরু পর থেকে এতিম, অসহায় ও অসুস্থ এবং শিশুদের খাদ্য সহায়তার কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় সাজ্জাদ পারভেজকে এ শুদ্ধাচার পুরস্কারে মনোনীত করা হয়েছে। ইতোপূর্বে ২০১৭ সালে তিনি কর্মক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য জেলা প্রশাসন পদক পেয়েছেন।
Leave a Reply