বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১১:৫১ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বরিশালে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, গত ১৫ বছর ধরে জনগণের ভোটাধিকার আদায় করতে গিয়ে মানুষ গুম, খুন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে। তিনি বলেন, “যারা নিজেদের দেশের মালিক ভাবতেন, তারা ২৪এ ছাত্রজনতার আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। এখন এটি জনগণের বাংলাদেশ।
তিনি জুলাই আন্দোলনে শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন, “যারা অকাতরে জীবন বিলিয়েছেন, তাদের মর্যাদা দিতে হলে দেশকে পুনর্গঠন করতে হবে। গণতন্ত্রকে মজবুত করতে হলে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।” তিনি সতর্ক করেছেন, ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে নির্বাচনী কার্যক্রমের প্রতি নজর রাখতে হবে যাতে কেউ ষড়যন্ত্র করতে না পারে।
নারী ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার জন্য ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর স্ত্রী বিবি খাদিজা (রা:) একজন কর্মজীবী নারী ছিলেন। বদরের যুদ্ধে হযরত আয়েশা (রা:) সৈনিকদের সরঞ্জামাদি সরবরাহ ও চিকিৎসা সেবা প্রদানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, দেশের নারীদের ঘরে বন্দি রেখে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের নারীদের শিক্ষা ব্যবস্থায় উদ্যোগী ছিলেন। তাঁর সময়ে এইচএসসি পর্যন্ত মেয়েদের ফ্রী শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
তারেক রহমান বলেন, বরিশালে প্রচুর কৃষি পণ্য উৎপাদিত হয়। কৃষকদের জন্য হিমাগার স্থাপন, কৃষি কার্ডের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে বীজ ও সার বিতরণ এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফের ঘোষণা দেন। ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন, যা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। তরুণদের প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
তিনি বলেন, খবরে দেখা গেছে গুপ্ত দল গোপনে ব্যালট, সিল ছাপাচ্ছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মা-বোনদের এনআইডি এবং বিকাশ নাম্বার নিয়ে নিচ্ছে। নির্বাচনের আগেই যারা অনৈতিক কাজ করে তারা কখনো সৎ মানুষের শাসন দিতে পারে না। মা বোনদের অপমান করে বলে আইডি হ্যাক হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছে আইডি হ্যাক হয়নি। অপরাধ ঢাকার জন্য মিথ্যা কথা যারা বলে তারা কখনো সৎ মানুষের শাসন দিতে পারে না। তাদের ষড়যন্ত্রের বিষয়কে সতর্ক থাকতে হবে। যাতে ১২ তারিখে আপনাদের অধিকার যাতে কেউ হাইজ্যাক করতে না পারে।
তারেক রহমান নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “গত ৫ই আগস্ট দেখেছি জনগণের শক্তি না থাকলে কি হয়।” তিনি সতর্ক করেন, নির্বাচনের আগে অনৈতিক কাজ করলে কেউ সৎ শাসন দিতে পারবে না। ভোটের অধিকার রক্ষা করতে সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি আরো বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি মানুষ তাদেরই নির্বাচিত করবে যারা দেশের মানুষের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে দেশ পরিচালনা করবে।” তিনি জনগণকে সঠিক ও সচেতন ভোট গ্রহণের জন্য সতর্ক করেছেন।
ধানের শীষে ভোট প্রার্থনা করে বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে তিনি বলেন, “আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এদের নজর রাখুন, ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে এরা আপনাদের দেখাশোনা করবে।”
দীর্ঘ দুই দশক পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দুপুর ১১টা ৫৫ মিনিটে হেলিকপ্টারযোগে বরিশাল স্টেডিয়ামের আউটার মাঠে অবতরণ করেন। হেলিকপ্টার থেকে নামার পর তাকে স্বাগত জানান বরিশাল বিভাগের শীর্ষ নেতা-কর্মীরা। এরপর সেখান থেকে গাড়িতে করে দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে সভা মঞ্চে পৌঁছান তিনি।
এসময় সড়কের দুই পাশ থেকে নেতাকর্মীরা তাকে নিয়া উচ্ছ্বাসিত হয়ে শ্লোগান দিতে থাকে। মঞ্চে উঠে তিনিও হাত নেড়ে জনসমাবেশে উপস্থিত লাখো নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের অভিবাদন গ্রহণ করেন।
এর আগে বেলা ১১টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও দোয়া-মোনাজাতের মাধ্যমে জনসভার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লা আমান প্রথম বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন। বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক জনসভায় সভাপতিত্ব করছেন। মহানগরের সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার ও বরিশাল দক্ষিণ জেলার সদস্যসচিব আবুল কালাম শাহীন যৌথভাবে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।
উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দির আহমেদ বীর বিক্রম, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বরিশাল সদর আসনের ধানের শীষের প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার, উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার, বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, বিভাগের ২১টি সংসদীয় আসনের বিএনপি ও জোট মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থীরা সহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সকাল থেকেই বেলস পার্ক ও আশপাশের এলাকা জনসভাস্থল রূপে রূপান্তরিত হয়। বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা থেকে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ সমাবেশে অংশ নেন। দলীয় পতাকা, ব্যানার ও শ্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে জনসভাস্থল। বেলস পার্ক মাঠে পৌঁছেই দেখা যায়, হাজারো নেতাকর্মী মাঠজুড়ে অবস্থান নিয়েছেন। তারা শ্লোগান দিচ্ছেন, প্রিয় নেতাকে স্বাগত জানাচ্ছেন। নেতাকর্মীদের উচ্ছ্বাসে পুরো এলাকা যেন পরিণত হয়েছে এক বিশাল রাজনৈতিক উৎসবে।
প্রসঙ্গত: ২০০১ সালে বেলস পার্ক মাঠে সর্বশেষ নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। দীর্ঘ ২৫ বছর পর একই মাঠে বক্তব্য দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান। এর আগে ২০০৬ সালের ১৪ মে বরিশালে তৃণমূল বিএনপির কর্মীসভায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
Leave a Reply