বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:০০ অপরাহ্ন
ডেস্ক রিপোর্ট ॥ বাংলাদেশের দারিদ্র্য হ্রাসের ধারায় অগ্রগতি থাকলেও ২০১৬ সাল থেকে দারিদ্র্য কমার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ দারিদ্র্য ও বৈষম্য মূল্যায়ন ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও সেই প্রবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকে কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে পারছে না। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি উচ্চ আয়ের মানুষের দিকে বেশি ঝুঁকছে, ফলে বৈষম্য বাড়ছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য ৫.৬ শতাংশে এবং মাঝারি দারিদ্র্য ১৮.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। কিন্তু গত প্রায় এক দশকে শ্রমবাজারে কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার ব্যাপকভাবে কমেছে। শিল্প খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি স্থবির হয়ে গেছে, ঢাকার বাইরের শহরগুলোতে প্রায় কোনো নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। প্রতি চারজন শিক্ষিত নারীর একজন কর্মহীন এবং দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক কম মজুরিতে কাজ করছে—যা দক্ষতার ঘাটতি ও শ্রমবাজারের সংকটকে তুলে ধরে।
বিশ্বব্যাংক জানায়, প্রবাস আয় দেশের দারিদ্র্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তুলনামূলক দরিদ্র পরিবারগুলো প্রবাস আয়ের সুবিধা বেশি পাচ্ছে। তবে বিদেশে যেতে উচ্চ খরচ দরিদ্র মানুষের জন্য বড় বাধা, ফলে আন্তর্জাতিক অভিবাসনের সুফল ধনী বা মধ্যমধনী শ্রেণির দিকে ঝুঁকে আছে। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ অভিবাসী শ্রমিকরা শহরের ঘিঞ্জি বসতিতে নিম্নমানের জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়লেও সেগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লক্ষ্যভিত্তিক নয়। ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সামাজিক সুরক্ষার সুবিধাভোগীদের মধ্যে ৩৫ শতাংশই ধনী পরিবার; অথচ অতি দরিদ্র অর্ধেক পরিবারও কোনো সুবিধা পায় না। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারের মতো খাতে সরকারি ভর্তুকির বড় অংশই ধনীদের কাছে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ সার্জিও অলিভিয়েরি বলেন, “বাংলাদেশ পূর্ব–পশ্চিমের আঞ্চলিক বৈষম্য কমাতে সক্ষম হলেও শহর–গ্রামের বৈষম্য বাড়ছে, বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে।” তিনি মনে করেন, উদ্ভাবনী নীতি, আধুনিক উৎপাদনশীল শিল্পে বিনিয়োগ, শহরাঞ্চলে গুণগত কর্মসংস্থান এবং কৃষিতে দরিদ্রবান্ধব মূল্যশৃঙ্খল দারিদ্র্য হ্রাসের গতি আবারও বাড়াতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকলেও ঝুঁকিতে রয়েছে। যে কোনো বড় বিপর্যয়ে তারা আবার দারিদ্র্যে নেমে যেতে পারে, যা সামাজিক নিরাপত্তা বলয়কে শক্তিশালী করার জরুরি প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
বিশ্বব্যাংক বলছে, দারিদ্র্য হ্রাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো কর্মসংস্থান, বিশেষ করে তরুণ, নারী ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য। অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়তে হলে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ, শ্রমবাজারে দক্ষতা উন্নয়ন এবং লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
Leave a Reply